কয়লার
আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছো তুমি চিরদিনের মতো।
এখানে
উৎসব সারারাত হ্যাজাকের আলো ঘিরে—
সকালবেলার
সৎকার সমিতির গাড়িতে আমরা তুলে দিতে এসেছি
মৃত পোকাদের
মর্গের
বাইরে দাঁড়িয়ে আছি আমরা পোকাদের আত্মীয়স্বজন
---------------------------------------------------------------------------------------------------------------
মেরুণ
শহরতলি থেকে
এক
মনে
আছে দিদি তোর
মায়ের
রক্তের ভেতর
ছুঁয়ে
বলেছিলাম তোকে
যদি
জন্মাতে পারি
যদি
জন্মাতে পারি কখনো
আমার
জন্মের বিনিময়ে তবে
ফিরিয়ে
দেবো যুবতী মায়ের ঋতু
সেই
থেকে আমিই তো শহরে শহরে বিলি করে বেড়াই শীত
আমিই
তো জলের মতো বয়ে যাই শহরের ভেতর দিয়ে
ভেতর দিয়ে
আমিই
তো বালিশের পাশে রেখে দিই
পালকের
খেলনা, পালকের গয়না
কানে
কানে বলে যাই –
আজ
কুয়াশা, মেয়েরা হাত ধরে হাঁটো ছেলেদের
আমিই
তো বৃষ্টির মধ্যে জল দিয়ে আসি গাছপালাদের
আমিই
তো পকেটে লজেন্স নিয়ে দৌড়ে যাই
ছেলেমেয়েদের হোস্টেলে
চিৎকার
করে বলি—
শাস্তি
দেওয়া অন্যায়
শাস্তি
দিওনা,
ওরা
জলের ছেলেমেয়ে
ওরা
হাওয়ার ছেলেমেয়ে
তোমরা
বুঝবেনা ওদের ভাষা
দুই
অথচ
দ্যাখো, কি আশ্চর্য ভাবে আমাদের সমস্ত চিন্তাভাবনা
জড়িয়ে পড়ছে শূন্যতার সঙ্গে
সন্ধেবেলায়
আমাদের ঘরের দিকে ভেসে আসছে পেচ্ছাপের গন্ধ
সন্ধেবেলায়
আমাদের দিকে নীচু হয়ে উড়ে আসছে
আলমারির ওপরের সাদা দেওয়াল
ঠান্ডা
মাছের মতো আমাদের নিয়ে আসা হচ্ছে বরফের বাইরে
আবার ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে বরফের
মধ্যে
যে
জীবন আমরা শুরু করেছিলাম হাস্পাতাল থেকে
সেই জীবন আবার গড়িয়ে যাচ্ছে
হাসপাতালের দিকে
মুখে
করে মাংসের টুকরো নিয়ে এসে পুঁতে রাখা হচ্ছে
আমাদের জানলার নীচে
আমাদের
বিছানায় ইচ্ছে করে পেতে দেওয়া হচ্ছে সাদা চাদর—
আমরা
বুঝতে পারছি না কিছুই,
বুঝতে
পারছি না কার কাছে গিয়ে ফেরৎ চাইবো আমাদের জীবন
তিন
জরায়ুর
ভেতরে শীত সাদা ব্যান্ডেজের মতো—
তবু
পাড়ায় পাড়ায় নাচের ইস্কুল,
ডিপ
ফ্রিজের দিকে ভেসে যাচ্ছে মেয়েদের হাসিঠাট্টা
মেয়েরা
ইতিহাস বইয়ের মতো, বরফের মলাটে ঢাকা
যেটুকু
মাংস লেগে থাকে আমাদের নখে,
সেইটুকুই স্বপ্ন আমাদের—
মাংস
মানে শীতকাল
মাংস
মানে ভ্রূণ
মাংস
মানে ঋতুবন্ধে সাদার্ণ ক্লিনিক
এবার
গ্রীষ্মের ছুটিতে আমরা বেড়াতে যাবো মাংসের দোকানে
চার
তবু
দ্যাখো, তরমুজ ক্ষেতের পাশে দাঁড়িয়ে আছি আমি
মালগাড়ির মতো
দ্যাখো,
প্রজাপতির মতো আমার আঙুলগুলো আবার ঝুঁকে পড়েছে
সাদা পৃষ্ঠার ওপর
দ্যাখো,
হাতে খাবার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি আমি
পাখিদের জন্য
দ্যাখো,
টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে আবার কিনেছি রঙ পেন্সিল
দ্যাখো,
ইস্কুল পালানোর রাস্তাগুলো আমি চিনিয়ে দিচ্ছি ছোটদের
দ্যাখো,
রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছি বেলুন হাতে নিয়ে
দ্যাখো,
তোমার পাশে শুয়ে কেমন মরতে ভয় করছে আমার
---------------------------------------------------------------------------------------------------------------
জলদস্যুর
চিঠি
এক
পরিত্যক্ত
জাহাজ, যদি ফিরে আসো আবার
দেখবে—
আমাদের
সমস্ত দারিদ্র্য আমরা
লুকিয়ে
ফেলেছি
তোমার
ছেড়ে যাওয়া শূন্য বন্দর
আমরা
সাজিয়েছি বাচ্চা মেয়েটির হাসিতে
প্রিয়
জাহাজ, অর্জুন আদর্শ নয় আমাদের
আমাদের
রক্তে কৃষ্ণের জীবাণু নেই আর
বন্ধুবান্ধবদের
বিরুদ্ধে আর অস্ত্র তুলি না আমরা
আমাদের
এখন এক নতুন পিয়ানো টিচার
সন্ধেবেলায়
এখন পিয়ানো ক্লাশ আমাদের
অভিমানী
জাহাজ, তুমি জানলে না
তোমার
ঢেউবাড়ির ডাকবাক্স এখন
ভরে
যায় নতুন বন্ধুর চিঠিতে
কোনো
মৃতদেহ আর তোমার বাড়ির
পাশ
দিয়ে যায় না
শান্তি
এখন তোমার পাশের বাড়ির বাসিন্দা
জাহাজ,
সমাধানের মতো
জটিল
প্রশ্নগুলো আমরা তুলি না আর
আমরা
এখন নিশ্চুপ হয়ে
ধানক্ষেতের
ছড়িয়ে পড়া লক্ষ্য করি
শ্যাওলাদের
বিপ্লব এখন আমাদের
পূর্ণ
সমর্থন—
জাহাজ,
ফিরে এসো আবার
শীতের
সার্কাসের মতো
তোমার
জন্য দুশ্চিন্তায় ঘুমোতে পারে না তরমুজক্ষেত
তোমার
জন্য সারারাত জেগে থাকে লেবুগাছ
জলদস্যুর
চিঠি – ২
আবার
কবে ছুটে যাবে তুমি এই গরীব জানলার পাশ দিয়ে
আবার
কবে বিকেলের হাওয়ায় উড়বে তোমার রঙিন পোশাক
কবে,
ওগো, কবে এসে দাঁড়াবে মাথার কাছে
ঘুম
থেকে তুলে বলবে—
ইস্কুলে শেখোনি কিছুই তাতে কি
হয়েছে
কলেজে যাওনি কোনোদিন তাতে কি হয়েছে
চলো,
বেড়িয়ে আসি, এই সন্ধেবেলায়, ইস্টার্ণ বাইপাসে
----------------------------------------------------------------------------------------------------------------
মিতু
আইসক্রীম
রেডিও
বেজে উঠছে, কাছে, কোথাও—
এই
ম্যালেরিয়া, টাইফয়েডের দেশে
এই
কাচের বয়ামের দেশে
জন্মনিয়ন্ত্রনের
দেশে
কাগজের
কুমীরের দেশে
বেজে উঠছে গান
গান
বাজলেই আমার মনে পড়ে আচারের গাড়ি,
মনে
পড়ে মিতু আইসক্রীম
এবার
গ্রীষ্মে,
আমি
একটা আইসক্রীমের গাড়ি ঠেলে ঠেলে নিয়ে যাবো
তোমাদের শহরে
এবার
গ্রীষ্মে,
আমি
আচার বিক্রি করবো তোমাদের পাড়ায়
মিতু,
তুমি শোনো গান ?
মিতু,
তুমি দোকানে আসো না কেন ?
দোকানদার কষ্ট পায়
আমাদের
জীবনে কোনো উৎসব নেই
শুধু
শোনো গান বেজে ওঠে
---------------------------------------------------------------------------------------------------------------
সবুজ
কালিতে লেখা
লোকে
জানুক আমাদের ভালোবাসার কথা
দেখে
যাক, দড়িতে মেলা আমাদের ছিন্ন শরীর
কেমন উড়ছে হাওয়ায়—
ফিরবার
পথে তুমি উড়িয়ে রেখো উনুনের ধোঁয়া,
দু’মুঠো চাল ফুটিয়ে রেখো
লোকে
জানুক সন্ধে-সন্ধে বাড়ি ফিরছি আমি
----------------------------------------------------------------------------------------------------------------
ট্যুরিস্ট
আমি
শহরের ছেলে বেড়াতে এসেছিলাম তোমাদের গ্রামে
আমি
গ্রামের ছেলে বেড়াতে এসেছিলাম তোমাদের শহরে
বেড়াতে
এসেছিলাম শীতের সার্কাসের মতো
ওগো
কালো কোট
ওগো
কালো টুপি
ওগো
কালো চশমা
আমি
বেড়াতে এসেছিলাম তোমাদের দেশে
-----------------------------------------------------------------------------------------------------------------
গল্পের
বই
সঙ্গে
থেকো , সঙ্গে থেকো মেয়েটির
যে
তোমাকে লুকিয়ে পড়ে
যে
তোমাকে লুকিয়ে রাখে লম্বা অঙ্ক খাতার ভেতর
হঠাৎ যখন দিদিমণি চলে আসে
তুমিতো
দেখেছো ওর অঙ্ক খাতা
দেখেছো
প্রতিটি অঙ্ক কেমন বিষন্ন
তুমিতো
দেখেছো ও টিফিনবাক্স খুললেই
পাখিরা কেমন ঘিরে ধরে চারদিক থেকে
শুকনো
পাতারা কেমন উড়ে যায় ওর দিকে
ওর
খুব ঘুম পায় শেষ বেঞ্চে বসে
অন্য
মেয়েরা তখন ক্লাস করে মন দিয়ে
বাইরে অপেক্ষা করে তাদের ছেলেবন্ধুরা
তুমি
ওকে সেই গল্পটা বোলো
যে
গল্পে এক রাজকুমার ব্যাঙ সেজে থাকে
যে
গল্পে এক রাজকুমার খুব গরীব
চাকরি খুঁজতে বেরোয়
তুমি
ওকে বোলো, সেই রাজকুমার ওর বন্ধু হতে চায়
------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
মেলোড্রামা
একটা
করুণ জলের রেখা গড়িয়ে যাচ্ছে কমলালেবু বাগানের দিকে
একে
কি ভালোবাসা বলবে তুমি ? বলবে বিবাহ?
কি
বলবে তুমি ? বলবে না কিছুই ?
রুমালের
মতো তবে হারিয়ে যাবো আমরাও?
শুধু
আলো জ্বলে ওঠে শোবার ঘরে, আলো
নিভে যায়
একে
কি ভালোবাসা বলবে তুমি? বলবে বিবাহ ?